কোভিড-১৯ ও ইউনানী চিকিৎসা

কোভিড-১৯ ও ইউনানী চিকিৎসা

গঠনগত ভাবে করোনা ভাইরাস আরএনএ ভাইরাস এর পরিবারভুক্ত । করোনা শব্দের শাব্দিক অর্থ মুকুট । এর আকৃতি অনেকটা রাজমুকুট এর মত এজন্য একে করোনা নামে অভিহিত করা হয় । চীনের উহান প্রদেশ থেকে ২০১৯ এর ডিসেম্বরে এ নতুন করোনা ভাইরাসটি মানুষে সংক্রামিত হয় । এদের অনেক প্রজাতি আছে তম্মধ্যে সাতটি মানবদেহে রোগ সংক্রমণ করে ।
(১) 229-E আলফা করোনা ভাইরাস ।
(২) NL-63 আলফা করোনা ভাইরাস ।
(৩) OC-43 বিটা করোনা ভাইরাস ।
(৪) HKU-1 বিটা করোনা ভাইরাস ।
(৫) MERS-COV বিটা করোনা ভাইরাস।
(৬) SARS-COV বিটা করোনা ভাইরাস।
(৭) SARS-COV-2 বিটা করোনা ভাইরাস।
মানুষের সারাবছর যে সর্দি কাশি হয় সে উপসর্গের জন্য এদের মধ্যে প্রথম চারটি দায়ী । SARS-COV-2 বিটা করোনা ভাইরাসকেই নোবেল করেনা ভাইরাস বা (COVID-19) কোভিড-১৯ বলা হয় । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ফেব্রুয়ারি-২০ এর দ্বিতীয় সপ্তাহে এর নাম দেন কভিড-১৯ ( COVID-19 ) বা করোনা ভাইরাস ডিজিজ ১৯ । এর অপর নাম (2019 NCOV) ২০১৯ এন সি ও ভি ।
এক মানব দেহ থেকে অন্য মানব দেহে এর সংক্রমণ বেশি । হংকং ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথ স্কুলের ভাইরোলজিস্ট ” লিও পুন “এটি প্রথম সনাক্ত করেন । যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা কুওয়াতে মুদাফিয়্যাহ্ কম তাদের মাঝে এই ভাইরাসটি বেশি ছড়ায় । এটি একটি গঠন পরিবর্তনশীল ভাইরাস । এটার Incubation period ( ইনকিউবেশন পিরিয়ড ) বা সংক্রামন থেকে উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার সময় দুই থেকে চৌদ্দ দিন । এটার সংক্রমণে সাধারণ ফ্লু বা সর্দিজ্বরের মতই উপসর্গ প্রকাশ পায় । যেমন – জ্বর , শুকনো কাশি , ক্লান্তি , সর্দি কাশি , গলাব্যথা , শ্বাসকষ্ট ও পাতলা পায়খানা ।
প্রাথমিক ভাবে সর্দি-কাশি , শুকনো কফ , বিরামহীন জ্বর , শ্বাসকষ্ট এবং শরীর ব্যথা এ কয়টি উপসর্গ একত্রে পাওয়া গেলে তিনি করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন ।
রোগ পরীক্ষার জন্য রোগীর গলায় একটি তুলার পুটলি ( Cotton swab ) প্রবেশ করিয়ে লালা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয় । এছাড়া রক্ত পরীক্ষা করে এন্টিবডির উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয় ।
দেহে ভাইরাস সংক্রমণের কারণ :
(১) নাযলা ওয়া যুকাম বা নাকেরসর্দি এবং বুকের সর্দি । বিশেষ করে উভয়টি একত্রে হওয়া । এতে করে দেহের তাবীআত বা স্বাভাবিক ক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায় এবং দেহ সংক্রামিত হয় ।
(২) নাকসে তাগজিয়্যাহ্ বা খাদ্য সংকট :
অনুপযোগী খাদ্য গ্রহন এবং উপবাস দ্বারা দেহ দুর্বল হয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেলে ।
(৩) অধিক রক্তক্ষরণ হয়ে দেহ দুর্বল হলে ।
(৪) ধূমপান , মদ্যপান এবং এ জাতীয় বিষাক্ত দ্রব্যের ব্যবহারের ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে ।
(৫) দূষিত বায়ু এবং দুর্গন্ধময় স্থানে অবস্থান ।
(৬) শর্করাযুক্ত বহুমূত্র , বৃক্ক প্রদাহ এবং জীবাণু ঘটিত রোগে আক্রান্ত হয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে ।
ভাইরাস ল্যাটিন ভাষার একটি শব্দ । অর্থ বিষ । প্রাচীনকালে রোগ সৃষ্টিকারী বিষাক্ত দ্রব্যকে ভাইরাস নামে অভিহিত করা হত । বর্তমানে ভাইরাস বলতে বুঝায় অতিক্ষুদ্র জৈব অনুজীব ।এগুলো জড় দেহে বর্ধনশীল নয় । জীব দেহে বর্ধনশীল । প্রাণী ও উদ্ভিদ দেহে বহু রোগ সৃষ্টির কারণ এ ভাইরাস । মানবদেহে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এ ভাইরাস মাদ্দা বা মূল উপাদানের পরিবর্তন ঘটায় । এতে করে ফুসফুস বেশি আক্রান্ত হয় ।
যতদূর জানা যায় ভাইরাসটি শীতল স্বভাবের । অধিক শীতলতাই ভাইরাসটির শুষ্কতার প্রমাণ । অর্থাৎ ভাইরাসটির মিযাজ শীতল শুষ্ক । অধিক শীতলতা দেহের আখলাত বা ধাতুরসের মধ্যে এক ধরনের জমাটবদ্ধতা সৃষ্টি করে । এতে করে বিভিন্ন অঙ্গ অবশ হয়ে পরে এবং সঞ্চালন হয় ক্রিয়া বাধাগ্রস্থ্ হয় ।
জমাটবাদ্ধতা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে , দেহের মাওয়াদ বা মূল উপাদান এবং রতূবাত বা রসপদার্থের গঠনগত ও অবস্থাগত যে পরিবর্তন স্বভাবিক ভাবে হয়ে থাকে এবং যেভাবে হয়ে থাকে তাতে বাধার সৃষ্টি হওয়া এবং গঠনগত পরিবর্তনের এ নিয়ম দুর্বল হয়ে যাওয়া । এতে করে অঙ্গের কুওয়াতে হায়াত এবং কুওয়াতে মানাআত তথা জিবনী শক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ শক্তি দুর্বল বা অকেজো হয়ে যায় । কোন অঙ্গের কুওয়াতে হায়াত বা জিবনী শক্তি অকেজো হয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে ঐ অঙ্গের মৃত্যু হওয়া ।
কভিড-১৯ ভাইরাসের তিনটি অংশ ।
(১) গ্লাইকোপ্রোটিন ।
(২) রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (RNA ) ।
(৩) লিপিড স্তর ।
লিপিড স্তর ভাঙলে ভাইরাসের মৃত্যু ঘটে । কারণ লিপিড স্তরই অন্যান্য অংশকে ধরে রাখে ।
সূয়ে মিযাজ বা স্বভাবের বিঘ্নতার স্তর বিবেচনায় কভিড-১৯ এ সংক্রামিতদের তিনটি স্তরে ভাগ করা যায় ।
(১) সূয়ে মিযাজে মুসতাহ্কাম বা সুদৃঢ় বিঘ্ন স্বভাব । যাতে মিযাজের মাদ্দাহ্ গত পরিবর্তন সুস্পষ্ট । অর্থাৎ সংক্রামনের সকল লক্ষন বিদ্যমান ও তীব্র ।
এই ক্ষেত্রে বিপরীত মিযাজের ওষুধ প্রয়োগ করতে হয় ।
(২) সূয়ে মিযাজে সাযিজ বা সরল বিঘ্ন স্বভাব ।স্বভাবের যে পরিবর্তন দ্বারা মাদ্দাহ্ বা আখলাত বিকৃত হয়নি । অর্থাৎ সংক্রামন হয়েছে এবং প্রাথমিক কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে বা পায়নি ।
এই ক্ষেত্রেও বিপরীত মিযাজের ওষুধ প্রয়োগ করতে হয় ।
(৩) সূয়ে মিযাজে মুস্তাউঈ বা অনুরুপ স্বভাব । যাতে সংক্রামন হয়নি কিন্তু শরীরের অবস্থা বিবেচনায় সংক্রমণ ঘটতে পারে । এক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং দোষ সৃষ্টির মূল কারণ দূর করতে হবে ।
এমত অবস্থায় সুস্থ্য ব্যক্তিদের কভিড-১৯ থেকে বাঁচার জন্য ( استظهار ) ইস্তেজহার তথা অগ্রীম সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে ।
সতর্কতার উপায়গুলো নিম্নে বর্ণিত হলো :
(১) তিরিয়াকে সমূম বা ফাদে যহর ( Anti toxin ) তথা বিষ নাশক ব্যবহার করতে হবে ।
(২) রোগজীবাণু কে শরীরে অ্যান্টিবডি (اجسام ترياقيه আজসামে তিরইয়াকিয়্যাহ্ ) করে দিতে হবে ।
(৩) উপযুক্ত স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে । (৪) আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে পরিমিত দূরত্ব বজায় রাখতে হবে ।
(৫) যে সকল কারণে ভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে ।
(৬) সংক্রামিত ব্যক্তিকে পর্যাপ্ত আলো বাতাস সমৃদ্ধ একটি কক্ষে রাখতে হবে । এবং বিষ নাশক উপাদান নিম , নিশিন্দা , কর্পূর , সত্তে পুদিনা , সত্তে আজওয়াইন , লোবান , ধুপ , তেজপাতা ইত্যাদি যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে অন্যদের মাঝে যেন না ছড়ায় তার ব্যবস্থা করতে হবে ।
(৭) আত্মরক্ষার জন্য রোগীর সেবা দানকারী এবং চিকিৎসা কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গকে পিপিই ( PPE ) ব্যবহার করতে হবে ।
সতর্কতামূলক বা আক্রান্তের স্তর অনুযায়ী নিন্মের ওষুধ গুলো ব্যবহার করা যেতে পারে :
(১) রসুন এক কোষ সমপরিমাণ দারচিনি (২৫০ মিলিগ্রাম ) দিনে ২-৩ বার ।
(২) সঙ্গে পুস্ত মুদাব্বার ১২ গ্রাম , মারওয়ারিদ ১ গ্রাম , জাফরান ৮ গ্রাম , সকল উপাদানের চুর্ন একত্র করে ১০০ মিলিগ্রাম করে দিনে দুইবার ।
(৩) গোলমরিচ ২০০ মিলিগ্রাম নিম পাতা ২০০ মিলিগ্রাম একত্র করে দিনে ২-৩ বার ।
তৈরি ওষুধের মধ্যে :
(১) আরক আজিব / আবে হায়াত / অমৃতধারা :
২-৩ ফোঁটা করে দিনে ২-৩ বার গরম পানিসহ ।
(২) হাব্বে তিরিয়াকী :
৫০০ মিলিগ্রাম থেকে ১ গ্রাম করে দিনে ১-২ বার ।
(৩) কুর্সে গার্লিট্যাব :
১২৫ মিলিগ্রাম করে দিনে ২-৩ বার ।
(৪) লাউকে সাপেস্তান :
১০ থেকে ১৫ গ্রাম করে দিনে ১-২ বার ।
(৫) দায়াকুজা :
১০ থেকে ১৫ গ্রাম করে ১-২ বার ।
(৬) কুশ্তা মারজান :
১০০ থেকে ১৫০ মিলিগ্রাম করে ১-২ বার ।
হাকীম মুহাম্মাদ জামাল উদ্দিন
প্রভাষক
ভোলা ইসলামিয়া ইউনানী মেডিকেল কলেজ
ভোলা ।
১৭ – ০৪ – ২০২০ ঈসায়ী

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *